বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তিন দিনব্যাপী (১১-১৩ জুন) বাছাইকৃত উপজেলা/থানা আমীরদের নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষাশিবির আজ ১৩ জুন (শনিবার) বিকালে সম্পন্ন হয়েছে।
সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও তারবিয়াত বিভাগীয় কমিটির সভাপতি মাওলানা এটিএম মা’ছুমের পরিচালনায় শিক্ষাশিবিরে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা ও সম্মানিত আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান।
আমীরে জামায়াত বলেন, “জামায়াতে ইসলামী একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আজকের পর্যায়ে এসেছে। সূচনালগ্নে অসীম ধৈর্য ও অপরিসীম ত্যাগের মাধ্যমে অল্পসংখ্যক লোকের অবদানে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”
তিনি বলেন, “সংগঠনের দায়িত্বশীলগণকে কথা ও কাজে গড়মিল পরিহার করতে হবে। উপজেলা/থানা আমীরগণ ট্রেনের ইঞ্জিনের ন্যায়। সংগঠনকে এগিয়ে নিতে হলে দায়িত্বশীলদের সঠিক সময়ে পরামর্শভিত্তিক সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “জামায়াতে ইসলামী ভারতীয় উপমহাদেশে কাজ করছে। বাংলাদেশ অধ্যায়ে বেশি পরীক্ষা দিতে হয়েছে। জামায়াত সূচনালগ্ন থেকেই একটি নীতি অবলম্বন করেছে- সমালোচকদের সঙ্গে অযথা জড়িয়ে যাবে না; বরং আমাদের কাজকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে। একান্ত বিভ্রান্তিমূলক কোনো বিষয় হলে সঠিকভাবে ও যৌক্তিক জবাব দিতে হবে। এ দেশের মানুষ জামায়াতের জনশক্তির আচার-আচরণ দেখবে এবং অন্যান্য দলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে। সবার সঙ্গে আমরা একটি ইতিবাচক ধারা তৈরি করবো। তাহলে যারা আমাদের থেকে দূরে চলে গেছে, তারাও এগিয়ে আসবে।

তিনি বলেন, জামায়াতের আলাদা কোনো আদর্শ নেই; আমাদের আদর্শের মডেল নবী মুহাম্মদ (সা.)। আমাদের আকিদার বাস্তব মডেল সাহাবায়ে কেরাম (রা.)। সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমে আমরা আদর্শের পথ খুঁজে নেব। এ দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে আকিদা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। ধর্মীয় মহলকে আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা কাজে লাগাতে চায়। এ ক্ষেত্রে আমাদের মাথা গরম করলে চলবে না। আমাদের ঈমান ও আমলের মান উন্নীত করার জন্য ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা করতে হবে। দ্বীনি মহলকে আমরা আল্লাহর জন্য মহব্বত করি। দ্বীনি মহলের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক তৈরি করতে হবে।”
মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “সমাজের বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। কায়েমি স্বার্থবাদীরা তাদের কর্তৃত্ব হারানোর ভয়ে বাধা দিতে আসবে এবং প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানী ব্যক্তিরা ইসলামী আন্দোলনের অসহযোগিতা করবে- এই বাধা অতিক্রম করতে হবে।”
আমীরে জামায়াত বলেন, “সমাজের তরুণ ও ছাত্ররা দলে দলে আমাদের দিকে আসছে। তাদেরকে কাজে লাগাতে হবে। ইসলামবিরোধীরা নানাভাবে আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে, সামাজিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করবে, পারিবারিকভাবে হেনস্তা করবে, গালিগালাজ করবে, মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে দেবে, ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলাবে, এমনকি ইসলামী দলকে নিষিদ্ধ পর্যন্ত করবে। কিন্তু তাদের কোনো কৌশলই কাজে আসবে না। আল্লাহর যে পরিকল্পনা আছে, সেটাই বাস্তবায়িত হবে।”
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “অনেকে এসে আমাদের নানা প্রস্তাব দেয়-দলকে আরও আধুনিক করা, শরিয়তের ব্যাপারে ছাড় দেওয়া, মহিলাদের পর্দার ব্যাপারে ছাড় দেওয়া ইত্যাদি। ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বিষয়ে আমরা আপস করব না। এর বাইরে যেসব ভালো প্রস্তাব রয়েছে, সেগুলো আমরা পর্যালোচনা করে দেখবো।”
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাক্কি জীবনের ১৩ বছরে নবীজি (সা.)-এর কাছে কোনো সামাজিক বিধান আসেনি। হিজরতের পর আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর কাছে সামাজিক বিধান প্রেরণ করেন। তিনি মসজিদে নববীতে বসেই তাঁর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, পরামর্শ ও বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন। সেখানে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, নারী-পুরুষ সবাই তাঁর কাছে আসত। তিনি সকলের কথাই অত্যন্ত গুরুত্ব ও মনোযোগের সঙ্গে শুনতেন এবং সমাধান দিতেন। আল্লাহর নবীর আচরণ দেখে অনেক অমুসলিম তৎক্ষণাৎ বায়আত গ্রহণ করতেন। আমাদেরকেও সেই আদর্শ লালন করতে হবে।”
জামায়াতের সংসদ সদস্য ও নেতাকর্মীদের উদ্দেশে আমীরে জামায়াত বলেন, “ক্ষমতা পেয়ে দুনিয়ার কোনো লোভের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাবে না। আমাদের পদক্ষেপ হবে খুবই সতর্ক। আমাদের এমপিরাও সদা সতর্ক থাকবেন। কোনো ধরনের হাট-বাজার ইজারা, বালুমহলের সুবিধা ইত্যাদি গ্রহণ করা যাবে না। সংসদে আমাদের যে অবস্থান আছে, সেখানে আমরা ইতিবাচক রাজনীতি করব, গঠনমূলক সমালোচনা করব এবং সত্যিকারের বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করব।
উপজেলা/থানা আমীরদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, আপনাদের এলাকায় যারা জামায়াতের এমপি নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের সহযোগিতা করা এবং পাহারা দেওয়া আপনাদের দায়িত্ব। তাদেরকে ভাইয়ের দৃষ্টিতে দেখবেন।”
ইসলামী ব্যাংকে উদ্ভূত পরিস্থিতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ইসলামী ব্যাংক নিয়ে নানামুখী ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমরা এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেব না। ব্যাংকে যদি একটি শেয়ারও আমার থাকে, আমি ওই ব্যাংকের মালিক। জনগণ আস্থার সঙ্গে তাদের আমানত এই ব্যাংকে রেখেছে। আমরা সবসময় তাদের পাশে আছি। তিনি বাংলাদেশসহ গোটা মুসলিম উম্মাহর জন্য মহান আল্লাহর কাছে কল্যাণ ও শান্তি কামনা করেন।”
শিক্ষাশিবিরে বিষয় ভিত্তিক আলোচনা উপস্থাপন করেন সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি জনাব মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য জনাব আব্দুর রব ও এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. ছামিউল হক ফারুকী, ড. খলিলুর রহমান মাদানী ও অধ্যাপক ড. আব্দুস সামাদ।
শিক্ষাশিবিরে তা’লিমুল কুরআন, বই, বিষয় ও গ্রুপ ভিত্তিক আলোচনায় ডেলিগেটগণ অংশগ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও গাজীপুর মহানগরী আমীর অধ্যাপক জামাল উদ্দিন এবং সেক্রেটারি জনাব আসম ফারুকের ব্যবস্থাপনায় গাজীপুরের টঙ্গীর শহীদ আবদুল মালেক অডিটরিয়ামে শিক্ষাশিবিরটি অনুষ্ঠিত হয়।


Discussion about this post