৫ সেপ্টেম্বর (শনিবার) রাজধানী ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে সকাল সোয়া ৮টায় ঢাকা টু চট্টগ্রাম লংমার্চ রাত পৌনে ৯টার দিকে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘি ময়দানে পৌঁছে। লংমার্চ কর্মসূচির সমাপনী সমাবেশে মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা ও আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান এমপি প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন।
তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ৬ দফার একটিও ১১ দলের নয়, এটি ১৮ কোটি মানুষের। গত ১২ ফেব্রুয়ারি দুটি ভোট হয়েছে। একটি জাতীয় সংসদ ও আরেকটি সংবিধান সংস্কারের জন্য গণভোট। গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে সংবিধান সংস্কার করা হবে। কিন্তু হ্যাঁ জয়যুক্ত হলেও বিএনপি তা করেনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে আর ফ্যাসিবাদ জন্ম নেবে না, জুলাই গণহত্যার বিচার আমরা পাবো।
তিনি আরও বলেন, দেশে গ্যাস নাই, বিদ্যুৎ নাই, কিন্তু বিল দিতে হচ্ছে জনগণকে। সমাজে হানাহনি, সন্ত্রাস ও চুরি-চামারিতে ঝাপিয়ে পড়েছে বিএনপির লোকেরা। ধরা পড়লে বলে ওরা আওয়ামী লীগের, তদন্তে দেখা যায় বিএনপির। পরে তারা বলে ওরা গুপ্ত।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের এ আন্দোলন ঈদের পরের আন্দোলন নয়, এ আন্দোলন জনগণের দাবি আদায়ের আন্দোলন। বিএনপি নির্বাচনের আগে ইশতেহারে জাতির কাছে যে ওয়াদা করেছিল – তা পূরণ করছে না।
তিনি আরও বলেন, এ সরকার গণভোটের প্রায় ৭০% মানুষের গণরায়কে বাস্তবায়ন না করে জাতিকে অপমান করছে। ৭০% জনগণের গণরায় বাস্তবায়ন না করে আমরা থামবো না। আমাদের লড়াই চলবে। আমরা বাংলাদেশকে বদলাবো, ইনশাআল্লাহ। আমরা আস্থাশীল জনগণ বিজয়ী হবে। যারা ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের কাছে মাথানত করবে, তারা হেরে যাবে। যদি সরকার জুলাই গণহত্যার বিচার না করে তাহলে ১১ দল জনগণের সরকার গঠন করে বিচার নিশ্চিত করবে।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপিট আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, দেশকে নেতৃত্ব দেয়ার কোনো পরিকল্পনা এ সরকারের নেই। বিরোধী দল সমর্থন না দিলে এ সরকার দেশ চালাতে পারবে না। সরকার গণভোটের গণরায় বাস্তবায় না করে জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। দেশ এখনো আধিপত্যবাদমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত হয়নি।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করলে বিরোধীদল সহযোগিতা করবে। আপনারা দুর্নীতি করলে আমরা এক বিন্দু সহযোগিতা করব না।
আমরা পরিস্কার করে বলে দিতে চাই- সংসদ ও রাজপথ আজ একাকার হয়ে গেছে। আপনাদের জবাব দিতে হবে। বিগত স্বৈরাচার দিয়েছে, কিন্তু আমরা আর ১৬ বছর অপেক্ষা করবো না।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বলেন, আমাদের লংমার্চের উদ্দেশ্য কোনো দলীয় বা ব্যক্তিস্বার্থে নয়, আমাদের উদ্দেশ্য হলো চব্বিশের ছাত্র-জনতা যে স্বপ্ন দেখেছিল স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার।
তিনি বলেন, স্বপ্ন ছিল গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার হবে। দুঃখজনক হলো বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের সাথে গাদ্দারি করছে। বিএনপি গাদ্দারি করলেও আমরা গাদ্দারি করতে পারবো না। এজন্য আজ আমাদের আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হলো।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জনতার সাথে প্রতারণা করলে, জনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে সরকারকে জনগণ ছাড় দেবে না। সরকার কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিবাদী পথে হাঁটলে তাদের ফেরাতে চট্টগ্রাম থেকে আন্দোলন শুরু হবে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই বিপ্লবের স্বপ্নের নতুন রাষ্ট্র নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই থামবে না।
সভাপতির বক্তব্যে এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে নিজেদের হক্ব আদায়ের জন্য। অতীতে অনেক সরকার এসেছে, কিন্তু কোনো সরকারের আমলে মাত্র ৬ মাসের মাথায় কেউ বলেনি এ সরকার টিকবে না। কিন্তু এই সরকারের সময় মানুষ এ কথা বলছে।
এর আগে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী শান্তিপূর্ণ লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ সকাল ৭টায় রাজধানীর শাপলা চত্বরে শুরু হয়। পবিত্র কোরআন তেলাওয়ায়াতরে মাধ্যমে শুরু হওয়া সমাবেশে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।
বক্তব্যের পর চট্টগ্রাম অভিমুখে সকাল সোয়া ৮টার দিকে লংমার্চের বহর রওনা হয়।
লংমার্চের রুটে পূর্ব নির্ধারিত বিভিন্ন পয়েন্টে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমটি নারায়ণঞ্জের কাচপুর ব্রিজের কাছে ট্রাকস্টান্ডে, কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহীপাল, চট্টগ্রামের মীরের সরাই এবং সবশেষ চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।
নির্ধারিত পথসভা ছাড়াও বিপুল মানুষের উপস্থিতিতে আরও বেশ কয়েকটি জায়গায় অনির্ধারিত পথসভা অনুষ্ঠিত হয়।
এসব পথসভায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। পথে পথে রাস্তার দুই ধারে শত শত মানুষ লংমার্চকে অভ্যর্থনা জানায়।
এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম,কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর জনাব নূরুল ইসলাম এমপি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, এনসিপির মূখ্য সমন্বয়ক জনাব নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, এবি পার্টির চেয়ারম্যান জনাব মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির মহাসচিব অধ্যাপক বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বিডিপির চেয়ারম্যান এডভোকেট একেএম আনোয়ারুল ইসলাম চান, গুম ফেরত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মুহাম্মাদ ফয়সাল, এনসিপির মুখপাত্র জনাব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া প্রমুখ।


Discussion about this post