মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি আজ ৯ অক্টোবর তুরস্কের ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘সেকেন্ড ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন বাংলাদেশ স্টাডিজ’-এ প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন।
‘বাংলাদেশ ২.০-এর সংস্কারের বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তুরস্ক–বাংলাদেশের সহযোগিতার নতুন দিগন্ত’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের যৌথ আয়োজক ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চ (সিপিএসআর)।
সম্মেলনে বাংলাদেশ, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক, গবেষক এবং বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। এতে বাংলাদেশের চলমান সংস্কারপ্রক্রিয়া, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রগঠন এবং তুরস্ক ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার সম্ভাবনাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদানকালে ডা. শফিকুর রহমান সম্মেলনের প্রতিপাদ্যসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশবিষয়ক গবেষণা, নীতিনির্ধারণী সংলাপ এবং পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক কোনো সাম্প্রতিক বা কেবল কয়েক দশকের বিষয় নয়; তুরস্কের জনগণের সাথে আমাদের রয়েছে শত বছরের ঐতিহ্যগত সম্পর্ক। এবং এই সম্পর্ক আগামীতে আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
এ পর্যায়ে মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের পটভূমি, জনগণের প্রত্যাশা, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং ‘বাংলাদেশ ২.০’-এর রূপরেখা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এর মধ্য দিয়েই সংঘটিত হয় জুলাই বিপ্লব। জনগণের প্রত্যাশা ছিল, বাংলাদেশে এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে দুর্নীতি থাকবে না, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সামগ্রিক উন্নতি হবে, সবার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে, বিচার বিভাগ পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা লাভ করবে এবং দুর্নীতিবাজদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, জনগণ আশা করেছিল, তাদের সন্তানেরা নিরাপদে থাকবে এবং তাদের জন্য উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। জনগণ এমন একটি সমাজের প্রত্যাশা করেছিল, যেখানে কোনো ধরনের বৈষম্য ও অসংগতি থাকবে না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের এসব প্রত্যাশা পূরণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। তাঁর মতে, এসব অধ্যাদেশ কার্যকর হলে দেশে পুনরায় ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্র ফিরে আসার পথ রুদ্ধ করা এবং একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা তৈরি হতে পারত। একটি দেশের উন্নতি, অগ্রগতি ও বিকাশের জন্য স্থিতিশীলতা অপরিহার্য বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জুলাই বিপ্লবের দেড় বছর পর বাংলাদেশে একই সঙ্গে দুটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর একটি ছিল জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচনের জন্য, অন্যটি ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের আমূল সংস্কার সাধনের লক্ষ্যে। পাশাপাশি সংবিধান থেকে সব ধরনের অযাচিত, অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় দূর করাও ছিল সংস্কারের অন্যতম উদ্দেশ্য।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিরোধী দলের সদস্য হিসেবে সে সময় ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে তাঁদের সংখ্যা ছিল ৭৭। তাঁরা দুটি শপথ গ্রহণ করেছিলেন—একটি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে জনগণের কাছে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও ক্ষমতাসীন সরকার সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
‘বাংলাদেশ ২.০’-এর ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তরুণ-তরুণীরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, তা বাস্তবায়নের জন্য তাঁরা এখনো লড়াই করে যাচ্ছেন। আর এটাই বাংলাদেশ ২.০। তাঁরা এমন একটি দেশ গড়তে চান, যেখানে তরুণ প্রজন্ম নেতৃত্বের আসনে থাকবে এবং প্রবীণ প্রজন্ম তাদের সহযোগী হিসেবে পাশে থাকবে।
তিনি বলেন, “আমরা চাই, আমাদের তরুণ প্রজন্ম ককপিটের আসনে বসবে আর আমরা বসব যাত্রীর আসনে। তারাই দেশ পরিচালনা করবে। আর সে জন্য আমরা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সেভাবেই তৈরি করছি।”
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি সবার কাছে দোয়া কামনা করেন এবং সম্মেলনটি সফলভাবে আয়োজনের জন্য আয়োজকদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।
সম্মেলনে মূল প্রবন্ধভিত্তিক বক্তব্য (কী-নোট) উপস্থাপন করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সাবেক উপদেষ্টা ও ইলদিরিম বেয়াজিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইয়াসিন আকতাই এবং যুক্তরাজ্যের সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোকাররম হোসাইন। উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস রেক্টর অধ্যাপক ড. মেহমেদ আদাক।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন তুরস্কের পার্লামেন্টের বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপের চেয়ারম্যান আকিফ ইলমাজ এমপি, তুরস্কের পার্লামেন্ট সদস্য মোস্তফা কায়া এমপি, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী এমপি, ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইরফান আহমেদ, বিশিষ্ট চিকিৎসক ড. এস. এম. খালেদুজ্জামান, তুরস্কের নিউ ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদ গকসু, ইয়ুথ ওয়েবের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম সাদ্দাম এবং তুরস্কের আনাতোলিয়ান ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশনের পররাষ্ট্রবিষয়ক বিভাগের প্রধান এমরুল্লাহ ডেমির প্রমুখ।
স্বাগত বক্তব্য রাখেন সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চের (সিপিএসআর) চেয়ারম্যান ড. হাফিজুর রহমান। সমাপনী বক্তব্য রাখেন ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. উসমান আকগুল। সম্মেলনটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন সিপিএসআরের নির্বাহী পরিচালক ড. এএসএম মাহমুদুল হাসান ও মো. মহিব্বুল্লাহ।
বিভিন্ন দেশের শিক্ষাবিদ, গবেষক, নীতিনির্ধারক ও কূটনীতিকদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ সম্মেলন বাংলাদেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক আলোচনা সম্প্রসারণ এবং তুরস্ক–বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা অন্বেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে।
#drshafiqurrahman #LeaderoftheOpposition #turkey #Bangladesh

Discussion about this post